Facebook · 22 August 2026
দৈনিক কালের কণ্ঠ, ঢাকা মাওলানা ফজলুর রহিম আশরাফী: জ্ঞান ও কর্মের এক উজ্জ্বল আলোকস্তম্ভ ড
দৈনিক কালের কণ্ঠ, ঢাকা মাওলানা ফজলুর রহিম আশরাফী: জ্ঞান ও কর্মের এক উজ্জ্বল আলোকস্তম্ভ ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন উপমহাদেশের জ্ঞানচর্চা ও দ্বীনি ঐতিহ্য এমন সব মহৎ ব্যক্তিত্বে ভরপুর, যাঁরা তাঁদের নিষ্ঠা, প্রজ্ঞা ও নিরলস সাধনার মাধ্যমে সমাজের চিন্তা ও নৈতিক কাঠামো নির্মাণে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। মাওলানা ফজলুর রহিম আশরাফী (রহ.) তেমনই এক আলোকিত ব্যক্তিত্ব, যার জীবন জ্ঞান ও কর্ম, দাওয়াত ও সংস্কার, শিক্ষা ও চরিত্রগঠনের এক অপূর্ব সমন্বয়। সময়ের স্রোত বয়ে যায়, মানুষ আসে-যায়; কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের কর্ম, চিন্তা ও অবদানের মাধ্যমে সময়কে অতিক্রম করে ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠেন। মাওলানা ফজলুর রহিম আশরাফী (রহ.) ছিলেন তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব—যিনি কেবল একজন আলেম নন, বরং একটি ধারার প্রতিনিধিত্বকারী, একটি ঐতিহ্যের ধারক এবং একটি আদর্শের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। ১৯৪৪ সালে অমৃতসরে জন্ম নেওয়া এই প্রখ্যাত আলিম এমন এক পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, যেখানে জ্ঞান, তাকওয়া ও দ্বীনি মূল্যবোধ ছিল জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর পিতা মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ হাসান অমৃতসরি (রহ.) ছিলেন একটি স্বনামধন্য দ্বীনি প্রতিষ্ঠান জামিয়া আশরাফিয়া, লাহোরের প্রতিষ্ঠাতা, যার প্রভাব তাঁর চিন্তা ও চরিত্র গঠনে গভীর ছাপ ফেলে। ফলে খুব অল্প বয়স থেকেই তিনি জ্ঞানার্জন ও আত্মগঠনের পথে অগ্রসর হন। মাওলানা আহমদ হাসান অমৃতসরি (রহ.) ছিলেন হাকিমুল উম্মত আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)এর খলিফা। মাওলানা আশরাফী প্রথাগত দারস-এ-নিজামী শিক্ষা সম্পন্ন করে হাদিস, তাফসির, ফিকহ ও ইসলামী দর্শনে উচ্চতর দক্ষতা অর্জন করেন। মাওলানা ফজলুর রহিমের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিল তাঁর ইলমী গভীরতা। তিনি দীর্ঘদিন জামিয়া আশরাফিয়ার শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। হাদিসশাস্ত্রে তাঁর পাণ্ডিত্য তাঁকে সমকালীন আলেমদের কাতারে একটি বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়। কিন্তু তিনি কেবল একজন গবেষক বা মুহাদ্দিস হিসেবেই থেমে থাকেননি; বরং শিক্ষা, পরিচালনা এবং নীতি-নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। তিনি তাঁর সময়ের সমস্যাগুলো গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন এবং প্রজ্ঞা ও ভারসাম্যের সাথে সেগুলোর সমাধানও তুলে ধরেছিলেন। তাঁর পাঠদানের ভঙ্গি ছিল সহজ, যুক্তিনির্ভর ও প্রভাববিস্তারকারী। তিনি শিক্ষার্থীদের কেবল বইয়ের জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ রাখতেন না; বরং তাঁদের নৈতিক ও বাস্তব জীবনের গঠনেও বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। ফলে তাঁর ছাত্ররা শুধু জ্ঞানীই হননি, হয়েছেন আদর্শবান মানুষও। তিনি দীর্ঘদিন প্রিন্সিপাল হিসেবে জমিয়া আশরাফিয়ার খিদমত আঞ্জাম দেন, যেখানে তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে শিক্ষাব্যবস্থা আরও সুসংগঠিত ও কার্যকর হয়ে ওঠে। পাশাপাশি, পাকিস্তানের বৃহত্তম মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তিনি হাজারো প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁর এই ভূমিকা কেবল প্রশাসনিক ছিল না; বরং ছিল একটি বৃহৎ শিক্ষাব্যবস্থাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার এক অবিরাম প্রচেষ্টা। ২০০১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি পাঞ্জাব কুরঅন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কুরআনের নির্ভুল মুদ্রণ ও সংরক্ষণেও তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। সংশ্লিষ্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি যে দায়িত্বশীলতা ও সতর্কতার পরিচয় দিয়েছেন, তা তাঁর দ্বীনি দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল প্রমাণ। তবে তাঁর প্রকৃত শক্তি ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বে—যেখানে ছিল সাদামাটা জীবনযাপন, গভীর চিন্তাশীলতা এবং মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। তাঁর বক্তব্য ছিল সংযত, যুক্তিনির্ভর এবং হৃদয়গ্রাহী। তিনি বিভাজন নয়, সংলাপকে প্রাধান্য দিতেন; কঠোরতা নয়, প্রজ্ঞা ও সহনশীলতাকে বেছে নিতেন। দাওয়াত ও সমাজসংস্কারের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল অনন্য। তাঁর বক্তব্যে ছিল না কোনো কঠোরতা বা উগ্রতা; বরং ছিল কোমলতা, প্রজ্ঞা ও হৃদয়গ্রাহী আবেদন। তিনি মানুষকে দ্বীনের পথে আহ্বান করতেন ভালোবাসা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে—যা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তারে সর্বদা কার্যকর। আজকের এই অস্থির সময়ে, যখন জ্ঞান অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকতা আর ধর্ম অনেক সময় বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন মাওলানা ফজলুর রহিম (রহ.)এর জীবন আমাদের সামনে এক ভিন্ন দৃষ্টান্ত হাজির করে। তিনি দেখিয়েছেন—ইলম তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখে; আর দ্বীন তখনই জীবন্ত, যখন তা সমাজে ন্যায়, সৌহার্দ্য ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠা করে। ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি তাঁর ইন্তিকাল শুধু একটি ব্যক্তির বিদায় নয়; বরং একটি যুগের অবসানের মতো। তবে তাঁর রেখে যাওয়া শিক্ষাধারা, চিন্তা ও মূল্যবোধ আজও আমাদের পথ দেখাতে সক্ষম। তাঁর জানাজার নামাজ জামিয়া আশরাফিয়া প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে হাজারো আলেম, রাজনৈতিক নেতা ও সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করেন।পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবায শরিফসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি তাঁর ইলমী ও দ্বীনি অবদানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। আমাদের প্রয়োজন—এমন মনীষীদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা, তাঁদের আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করা এবং তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা। তবেই আমরা একটি জ্ঞানভিত্তিক, নৈতিক ও সুস্থ সমাজ গঠনের পথে এগোতে পারব। মাওলানা ফজলুর রহিম আশরাফী নিভে যাননি; বরং তিনি রয়ে গেছেন তাঁর কর্ম, তাঁর ছাত্র এবং তাঁর চিন্তার মাঝে—এক চিরন্তন আলোর উৎস হয়ে। তাঁর লেখনিও ছিল এই চিন্তারই প্রতিফলন। সমাজের নানা সমস্যার চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি তিনি সেগুলোর ইতিবাচক সমাধানও উপস্থাপন করেছেন। তাঁর ভাষা ছিল প্রাঞ্জল, সাবলীল ও যুক্তিসমৃদ্ধ—যা পাঠককে শুধু আকৃষ্টই করে না, বরং ভাবনার জগতে নাড়া দেয়। আলোকিত সাক্ষাৎধারা মানুষের জীবনে কিছু সাক্ষাৎ থাকে—সংক্ষিপ্ত, অথচ গভীর; ক্ষণিক, অথচ স্থায়ী। প্রখ্যাত আলেম মাওলানা ফজলুর রহিম আশরাফীর সঙ্গে আমার তিনটি সাক্ষাৎ তেমনই স্মৃতির অংশ, যা শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, বরং এক আলোকিত মানুষের সান্নিধ্যে প্রাপ্ত আত্মিক সম্পদের সাক্ষ্য। প্রথমবার তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটে বাংলাদেশ সফরকালে, চট্টগ্রামের লালখান বাজার মাদরাসার বার্ষিক মাহফিলে। জনসমুদ্রের মাঝে তাঁর উপস্থিতি ছিল এক প্রশান্তির কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর বক্তব্যে ছিল মাধুর্য, গভীরতা ও হৃদয়স্পর্শী আবেদন—যা শ্রোতাদের অন্তরে নীরবে নাড়া দিত। দ্বিতীয় সাক্ষাৎটি ছিল আরও গভীর ও স্মরণীয়। মদীনা মনোওয়ারার পবিত্র ভূমিতে, জান্নাতুল বাকীতে—যেখানে সাহাবায়ে কেরামের নূরানি স্মৃতি ছড়িয়ে আছে—সেখানে হঠাৎ তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। আমি আমার ভাগিনা মাওলানা সুহাইলুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে কবর যিয়ারতে গিয়েছিলাম। কবরস্থানের সেই নির্জন, ভাবগম্ভীর পরিবেশে তাঁর সঙ্গে কুশল বিনিময়ের পর আমি তাঁর কাছে দোয়া প্রার্থনা করি। তিনি যে দোয়া করেছিলেন, তা আজও আমার হৃদয়ে অনুরণিত হয়: “হে আল্লাহ, আজ যেমন জান্নাতুল বাকীতে খালিদ সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে গেল, তেমনি জান্নাতুল ফেরদৌসেও আমাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিন।” এ দোয়া শুধু শব্দ ছিল না—ছিল এক অন্তরের আকুতি, এক আধ্যাত্মিক বন্ধনের প্রকাশ। তৃতীয় ও শেষ সাক্ষাৎ ঘটে ২০২৫ সালে, আমার রাষ্ট্রীয় সফরে লাহোর গমনের সময়। জামিয়া আশরাফিয়া প্রাঙ্গণে তাঁর বাসভবনে গিয়ে তাঁকে দেখি বার্ধক্যের ভারে ন্যুব্জ। তিনি তখন আর কথা বলতে পারছিলেন না। কিন্তু তাঁর চোখ, তাঁর ইশারা—সবই যেন ভাষার সীমা অতিক্রম করে কথা বলছিল। তিনি ইশারায় শুভেচ্ছা জানালেন, দোয়া করলেন এবং লিখিতভাবে আমাকে হাদিসের ইজাযত প্রদান করলেন। সেই মুহূর্তটি ছিল একই সঙ্গে আবেগময় ও গৌরবের—যেন একটি আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার নীরবে হস্তান্তরিত হলো। এরপর চলতি বছরের জানুয়ারিতে তাঁর ইন্তিকালের সংবাদ আসে—এক গভীর শূন্যতার অনুভূতি নিয়ে। মনে হলো, একটি আলোকবর্তিকা নিভে গেল; কিন্তু তাঁর আলো নিভে যায়নি, ছড়িয়ে আছে অসংখ্য হৃদয়ে, তাঁর ছাত্রদের মাঝে, তাঁর রেখে যাওয়া ঐতিহ্যে। আজ যখন সেই তিনটি সাক্ষাতের কথা স্মরণ করি, তখন উপলব্ধি করি—মাওলানা ফজলুর রহিম আশরাফী কেবল একজন মহান আলেমই ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক স্নেহময়, আধ্যাত্মিকভাবে প্রজ্ঞাবান মানুষ, যার প্রতিটি আচরণে ছিল মমতা, বিনয় ও আল্লাহমুখী এক গভীর সম্পর্কের প্রতিফলন। এমন মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের স্মৃতি, তাঁদের দোয়া, তাঁদের শিক্ষা—চিরকাল পথ দেখাতে থাকে। আজকের এই সময়ে, যখন জ্ঞান অনেকাংশে কেবল ডিগ্রিতে সীমাবদ্ধ এবং দ্বীন অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত, তখন মাওলানা আশরাফীর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সত্যিকারের জ্ঞান সেই যা মানুষের চরিত্রে প্রতিফলিত হয়, আর সত্যিকারের দ্বীন সেই যা সমাজে কল্যাণ, ভালোবাসা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে। অতএব, আমাদের উচিত এমন মনীষীদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা এবং নিজেদের ব্যক্তি ও সামষ্টিক জীবনে তাঁদের আদর্শ অনুসরণ করা। যদি আমরা জ্ঞানকে নিষ্ঠার সাথে এবং কর্মকে দায়িত্ববোধের সাথে একত্র করতে পারি, তবে নিশ্চয়ই আমরা একটি সুন্দর ও কল্যাণমুখী সমাজ গঠনে অবদান রাখতে সক্ষম হবো। মাওলানা ফজলুর রহিম আশরাফীর জীবন এক উজ্জ্বল প্রদীপের মতো—যার আলো আজও পথ দেখাতে পারে; প্রয়োজন শুধু সেই আলোকে গ্রহণ করার আন্তরিকতা। মাওলানা ফজলুর রহিম আশরাফীর জীবন আমাদের শিখায় সত্যিকারের জ্ঞান কেবল অর্জনের বিষয় নয়; তা সমাজে প্রয়োগ ও মানবকল্যাণে নিবেদনের মধ্যেই তার পূর্ণতা। তাঁর ইলমী ঐতিহ্য ও খেদমত যুগ যুগ ধরে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। #
First published in Facebook. View the original page
