Dr. A F M Khalid HossainA F M Khalid Hossain

দৈনিক নয়া দিগন্ত · 13 September 2026

উম্মাহর ঐক্য ও পুনর্জাগরণে শায়খ সাজ্জাদ নদভীর প্রজ্ঞাপূর্ণ আহ্বান

দৈনিক নয়া দিগন্ত, ঢাকা।

উম্মাহর ঐক্য ও পুনর্জাগরণে শায়খ

সাজ্জাদ নদভীর প্রজ্ঞাপূর্ণ আহ্বান

ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন

বিশ্বখ্যাত ইসলামিক স্কলার শায়খ ড. আল্লামা খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নদভী হাফি. সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসে ঢাকা ও কক্সবাজারে বিভিন্ন উলামা সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। তাঁর বক্তব্য ছিল গতানুগতিকতার বাইরে ব্যতিক্রমধর্মী ও প্রজ্ঞাপূ্র্ণ। তাঁর চিন্তাশক্তির ব্যাপকতা আলিমদের চোখ খুলে দিয়েছে। জীবন ও সমাজকে নতুনভাবে চেনার প্রণোদনা রয়েছে তাঁর বক্তব্যে। তিনি পারস্পরিক ভেদাভেদ ভুলে উম্মাহর অখণ্ড ঐক্যের উপর জোর দিয়েছেন বেশি। তাঁর বক্তব্য ছিল চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী। শায়খ সাজ্জাদ নদভী মূলত দাওয়াত, তারবিয়াত, উম্মাহর ঐক্য, রাষ্ট্রচিন্তা এবং যুগোপযোগী ইসলামী নেতৃত্বের একটি সমন্বিত রূপরেখা তুলে ধরেছেন। এটি কেবল একটি আবেগনির্ভর বক্তৃতা নয়; বরং ইসলামী সভ্যতা পুনর্গঠনের জন্য একটি চিন্তাগত কর্মপরিকল্পনা হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে।

উম্মাহর ব্যাপকতা

শায়খ সাজ্জাদ নদভীর মতে, উম্মাহ শুধু আলিমদের সমষ্টি নয়। উম্মাহ হলো এমন একটি সমাজ, যেখানে কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, লেখক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, নারী-পুরুষ এবং তরুণ—সকলেই ইসলামের বৃহত্তর পরিবারের অংশ। তাই আদর্শ ইসলামী সমাজ গড়তে হলে সমাজের প্রতিটি স্তরকে নৈতিকতা, ন্যায়বিচার, আমানতদারি ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করতে হবে। ক্ষুধামুক্ত, বৈষম্যহীন এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজই প্রকৃত ইসলামী সমাজ। ইসলামের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন এই সব শক্তি একই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছে, তখনই মুসলিম সভ্যতা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে। আর যখন তারা বিচ্ছিন্ন হয়েছে, তখনই শুরু হয়েছে অবক্ষয়।

উলামা ও সাধারণ মানুষের দূরত্ব

তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, যদি আলিমদের সম্পর্ক শুধু মাদরাসা বা মসজিদের সীমায় আবদ্ধ থাকে, তবে সমাজের বৃহৎ অংশ নেতৃত্বহীন হয়ে পড়বে। এই বক্তব্য বর্তমান বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন। আলিমদের সামাজিক উপস্থিতি যত বিস্তৃত হবে, ইসলামের ইতিবাচক প্রভাবও তত বিস্তৃত হবে। তিনি উলামায়ে কিরামের দায়িত্বকেও নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর ভাষায়, নবী-রাসূলদের মতোই আলিমদের প্রথম দায়িত্ব আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলম গ্রহণ করা এবং দ্বিতীয় দায়িত্ব সেই ইলমের আলোকে মানুষের তারবিয়াত করা। এই তারবিয়াত কেবল মাদরাসার ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; বরং সমাজের প্রতিটি শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।

মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষার মধ্যে দূরত্ব

বর্তমান সময়ে মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তিনি সেটিকে মুসলিম সমাজের অন্যতম বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, আজকের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের মন্ত্রী, প্রশাসক, বিচারক, নীতিনির্ধারক, সাংবাদিক ও রাষ্ট্রনায়ক। তাই তাদের প্রতি অবজ্ঞা নয়, ভালোবাসা ও দাওয়াতের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। ইসলামী সাহিত্য পাঠ, প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা, সেমিনার, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, তা সময়োপযোগী ও বাস্তবধর্মী। তাঁর মতে, বর্তমান মুসলিম সমাজের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার বিভাজন। এই ব্যবধান দূর করার আহ্বান ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠনের জন্য অত্যন্ত সময়োপযোগী।

মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যকার দূরত্ব নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার মধ্যে যে অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়েছে, তা মুসলিম সমাজের জন্য ক্ষতিকর। ইসলামের ইতিহাসে আলিম, চিকিৎসক, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও দার্শনিক—সবাই একই জ্ঞানধারার অংশ ছিলেন। আধুনিক যুগে সেই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি পুনরুদ্ধার করা সময়ের দাবি।

মাদরাসা শিক্ষার সংস্কার

এই প্রসঙ্গেও শায়খের বক্তব্য ছিল ভারসাম্যপূর্ণ। তিনি আধুনিক জ্ঞানকে কখনো দ্বীনি শিক্ষার বিকল্প হিসেবে দেখেননি; বরং দাওয়াত ও সমাজসেবার একটি প্রয়োজনীয় মাধ্যম হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। ব্যাংকিং, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, আইসিটি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কিংবা সমসাময়িক ফিকহের জটিল প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আধুনিক বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা থাকা অপরিহার্য—এই উপলব্ধি তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যে শিক্ষাব্যবস্থার মানবিক সংস্কারের আহ্বানও ছিল। শিশুদের প্রতি কঠোরতা, শারীরিক প্রহার, ভয়ভিত্তিক শিক্ষা এবং নেতিবাচক পরিবেশের পরিবর্তে ভালোবাসা, উৎসাহ ও সুন্দর চরিত্র গঠনের ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ, একজন শিক্ষক শুধু জ্ঞান দেন না; তিনি ভবিষ্যৎ মানুষও গড়ে তোলেন। এটি আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

শাসকদের সঙ্গে আলিমদের সম্পর্ক

তিনি বলেন, শাসকদের সাথে আলিমদের সুসম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। রাজনৈতিক তোষামোদ বা ব্যক্তিগত সুবিধা প্রাপ্তির স্বার্থে নয়, বরং নববী পদ্ধতিতে শাসকদের কল্যাণ কামনা ও নসীহতের কথা বলেছেন। ইতিহাসে নবী-রাসূল, সাহাবায়ে কেরাম এবং বহু মুজাদ্দিদের কর্মপদ্ধতির সঙ্গে এর মিল পাওয়া যায়। এতে সংঘাতের পরিবর্তে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফিরআউনের নিকট হযরত মূসা (আ.)-কে প্রেরণের উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, একজন দাঈ কখনো কাউকে নিয়ে চূড়ান্ত হতাশ হতে পারেন না। দাওয়াতের ভিত্তি আশা, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসা। তাঁর বক্তব্যে আশাবাদের সুরও ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।

শায়খ সাজ্জাদ নদভী বলেন, আমলা, সাংবাদিক, শিক্ষক, লেখক, বিচারক—এই শ্রেণির মানুষ সমাজের গতিপথ নির্ধারণ করেন। তাই তাঁদের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য পৌঁছে দেওয়াকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে দেখিয়েছেন। একজন দাঈর কাজ মানুষকে দূরে ঠেলে দেওয়া নয়; বরং কাছে টেনে নেওয়া। এটি বাস্তববাদী দাওয়াতি চিন্তা। তিনি আলিমদের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার ওপর জোর দিয়েছেন। অর্থনৈতিকভাবে শাসকের ওপর নির্ভর না করেও তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা সম্ভব—এই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত মূল্যবান।

কুরআনকেন্দ্রিক সামাজিক আন্দোলন

শায়খ সাজ্জাদ নদভী মসজিদকে কার্যকর দ্বীনি ও সামাজিক শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন। জুমার বয়ান এবং নিয়মিত সংক্ষিপ্ত দারসুল কুরআনের আসর চালুর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ও যুবকদের আল্লাহর কালামের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত করা সম্ভব। পাশাপাশি, পর্দার সুব্যবস্থা রেখে নারীদের এবং কলেজপড়ুয়া মেয়েদের এই দারসগুলোতে সম্পৃক্ত করার মধ্য দিয়ে তিনি একটি শিক্ষিত ও সচেতন নারীসমাজ গড়ে তোলার দূরদর্শী চিন্তা প্রকাশ করেছেন।

​

​যুবসমাজকে আকৃষ্ট করার জন্য তিনি গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে আধুনিক ও সৃজনশীল পদ্ধতির প্রস্তাব করেছেন। কলেজ ও বিশ্ববিদয়ালয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় প্রবন্ধ লেখার প্রতিযোগিতার আয়োজন এবং আকর্ষণীয় পুরস্কারের ঘোষণা তরুণ প্রজন্মের সুপ্ত মেধা ও মননকে ইসলামের সোনালী ইতিহাসের দিকে ধাবিত করার এক চমৎকার কৌশল। ​প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাতভিত্তিক বই ফ্রি উপহার দেওয়া এবং তা পাঠের সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে যুবকরা নবীর (সা.) জীবনযাপনের সরলতা, মমতা, কোমলতা এবং যুবকদের প্রতি তাঁর বিশেষ স্নেহের কথা জানতে পারবে। আবেগ বা জোরজবরদস্তি নয়, বরং প্রিয়নবীর সুমহান চরিত্রের বাস্তব রূপ দেখে যুবকদের অন্তরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইসলামের প্রতি ভালোবাসা ও পরিবর্তন আসবে।

​

​পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বিজয়ী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তাদের বাবা-মা ও শিক্ষকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে সম্মানিত করার প্রস্তাবটি অত্যন্ত চমৎকার। এটি একদিকে যেমন তরুণদের কাজের স্বীকৃতি ও উৎসাহ জোগায়, অন্যদিকে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে দ্বীনি আলিমদের একটি সুদৃঢ় ও সম্মানজনক সেতু বন্ধন তৈরি করে।

​

​শায়খ নদভী বর্তমান সময়ের উপযোগী ও আধুনিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য আলিম সমাজকে তাদের পুরোনো ও গতানুগতিক কর্মপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। সময়ের ভাষা বুঝে বুদ্ধিমত্তা (হিকমাহ) ও আধুনিক উপায়ে কাজ না করলে যুবসমাজকে দ্বীনের ছায়াতলে ধরে রাখা অসম্ভব—এটাই এই বক্তব্যের মূল শিক্ষা।

ভিন্নমতে সহনশীলতা

তিনি মুসলিম সমাজের আরেকটি দুর্বলতার দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন—পারস্পরিক বিভক্তি। তাঁর মতে, বিভিন্ন মাসলাক ও ইসলামী ধারার মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে; কিন্তু তা শত্রুতায় রূপ নেওয়া উচিত নয়। তিনি মৌমাছির উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, যেমন মৌমাছি বিভিন্ন ফুল থেকে মধুরস সংগ্রহ করে একত্রে মধু তৈরি করে, তেমনি উম্মাহর প্রতিটি ধারার ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। কেউ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ভালোবাসায় অগ্রগামী, কেউ তাওহীদের চর্চায়, কেউ দাওয়াতে, কেউ তালিমে, কেউ জিহাদের চেতনায়, কেউ ইকামাতে দ্বীনের প্রচেষ্টায়—এসব শক্তিকে প্রতিযোগিতায় নয়, সমন্বয়ে রূপ দিতে হবে।

শায়খ সাজ্জাদ নদভী বলেন, বিভিন্ন মাসলাক ও জামাআতের মধ্যে কল্যাণের উপাদান রয়েছে। ভালোকে গ্রহণ করতে হবে, অপ্রয়োজনীয় বিরোধ নয়। এটি উম্মাহর ঐক্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি। ইসলামী সভ্যতা গড়তে আলিম, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রশাসক—সবাই অপরিহার্য।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বিভিন্ন স্বভাবের সাহাবিদের নিয়ে যে বহুমাত্রিক নেতৃত্ব গড়ে তুলেছিলেন, সেটিকেই তিনি বর্তমান যুগের জন্য অনুসরণীয় মডেল হিসেবে তুলে ধরেছেন।

বৈচিত্র্যের মধ্যেই ঐক্য

শায়খ নদভী যে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন, তা হলো—উম্মাহকে একটি 'কার্বন কপি'তে পরিণত করার চেষ্টা নয়; বরং ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যের মধ্যেই ঐক্য গড়ে তোলা। যেমন একটি ফুটবল দলে গোলকিপার, ডিফেন্ডার, মিডফিল্ডার ও ফরোয়ার্ড—সবার ভূমিকা আলাদা; তেমনি মুসলিম সমাজেও আলেম, বিজ্ঞানী, প্রশাসক, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা ও তরুণ—প্রত্যেকের ভূমিকা স্বতন্ত্র এবং সমান গুরুত্বপূর্ণ। শায়েখ সাজ্জাদ নদভী যে বিষয়টির ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, তা হলো উম্মাহর ঐক্য। তিনি বলেন, উম্মাহ কখনো একটি মাত্র ধারা বা একটি মাত্র সংগঠন দিয়ে গঠিত হতে পারে না। ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন মাযহাব, চিন্তাধারা ও কর্মক্ষেত্র পরস্পরকে সমৃদ্ধ করেছে। তাই সবাইকে এক রকম বানানোর চেষ্টা নয়; বরং বৈচিত্র্যের মধ্যেই ঐক্য গড়ে তোলাই ইসলামের শিক্ষা।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাঁর এই বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আমাদের সামনে যেমন ঐক্যের সুযোগ রয়েছে, তেমনি বিভক্তির ঝুঁকিও রয়েছে। এই বাস্তবতায় প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, যুগোপযোগী শিক্ষা, প্রজ্ঞাভিত্তিক নেতৃত্ব এবং সমাজের সব শ্রেণির মানুষের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা।

শুধু দ্বীনদার নয়, প্রজ্ঞাবানও হতে হবে

তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তুলে ধরেছেন—নৈতিকতা ও দক্ষতা উভয়ই প্রয়োজন। বিশ্বনেতৃত্ব অর্জনের জন্য তাকওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতাও অপরিহার্য।

তিনি বলেছেন, শুধু ধার্মিক হওয়া যথেষ্ট নয়; অভিজ্ঞ ও দূরদর্শী মানুষের সাহচর্যও প্রয়োজন। নেতৃত্ব বিকাশে এটি একটি মৌলিক নীতি।

​ইতিবাচক সুযোগের সদ্ব্যবহার

​এই বক্তব্যে শায়খ সাজ্জাদ নদভী একটি অত্যন্ত বাস্তবমুখী ও প্র্যাগম্যাটিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তিনি এমন একটি রাজনৈতিক বা শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর কথা বলেছেন, যা সরাসরি নিজেদের ইসলামী বা খেলাফত দাবি না করলেও ইসলাম চর্চা এবং দ্বীনি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখছে। তাত্ত্বিক বা আদর্শগত মতপার্থক্য থাকার পরও বিদ্যমান সুযোগগুলোকে কাজে লাগিয়ে বহুমুখী খেদমত চালিয়ে যাওয়ার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

​

তিনি তাঁর ​বক্তব্যে যেসব মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করেছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বাধাহীন ​মাদরাসা পরিচালনা, ​নারীদের পর্দার পূর্ণ স্বাধীনতা,​লাউডস্পিকারে আজান ও জামাআত চালুর অনুমতি, ​সরকারি চাকুরিতে যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রবেশের সুযোগ,​যুবকদের প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও সভা-সম্মেলনের আয়োজন

​—এগুলো হলো যেকোনো দ্বীনি ও সামাজিক আন্দোলনের ভিত্তি। এই সুযোগগুলো হাতছাড়া না করে বরং এগুলোর সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করার মাধ্যমে সমাজ ও জনশক্তিকে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ​বক্তব্যটির মূল বার্তা হলো—তাত্ত্বিক বিতর্কে জড়িয়ে বা অযথা সংঘাতের পথ বেছে নিয়ে অর্জিত সুযোগগুলো নষ্ট করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বরং বর্তমান কাঠামোর ভেতরে থেকেই শিক্ষা, দাওয়াত, প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং একটি ইতিবাচক পরিবর্তন সাধনের পথে এগিয়ে যাওয়া উচিত।

​আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়ার গুরুত্ব

​তিনি তাঁর বক্তব্যে আলেম সমাজের মতো দায়িত্বশীল গোষ্ঠীর আত্মশুদ্ধির ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছেন। বাহ্যিক ইলম অর্জনের পাশাপাশি মনের ভেতরের রোগ—বিশেষ করে অহংকার এবং হিংসার মতো মারাত্মক আত্মিক ব্যাধিগুলো কীভাবে একজন মানুষের সমস্ত ভালো আমল ও অর্জনকে ধূলিস্যাৎ করে দিতে পারে, সে বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন তিনি। ​বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও মুজাদ্দিদ শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.)-এর আল-ফাওযুল কাবীর ফী উসূলিত তাফসীর গ্রন্থের এই প্রসঙ্গ টেনে শায়খ সাহেব একটি ঐতিহাসিক ও কোরআনিক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। ইহুদিদের প্রধান সমস্যা ছিল সত্য জানার পরেও তা অহংকারবশত অস্বীকার করা এবং নিজেদের জানাশোনা ও মর্যাদার বিষয়ে হিংসা ও সংকীর্ণতায় ভোগা। উম্মতের কোনো আলেম বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের মধ্যে যদি ইলম থাকার পরও এই একই মানসিকতা ও দম্ভ তৈরি হয়, তবে তা উম্মতের জন্য ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করে।

​

​বক্তব্যটির মূল বার্তা কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে হেয় করা নয়; বরং দ্বীনি অঙ্গনের নেতৃত্বদানকারী ওলামায়ে কেরামকে তাদের অর্পিত আমানতের ব্যাপারে অত্যন্ত বিনম্র ও সতর্ক থাকার তাগিদ দেওয়া। জ্ঞান ও যোগ্যতার অহংকার এবং পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করে ইখলাসের সাথে দ্বীনের খেদমত করার মাধ্যমেই কেবল উম্মতকে সঠিক পথে পরিচালনা করা সম্ভব—এ কথাই এখানে জোরালোভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

মুজাদ্দিদে আলফে সানীর কর্মপদ্ধতি

এই প্রসঙ্গে তিনি ইমামে রব্বানী মুজাদ্দিদে আলফে সানী রহিমাহুল্লাহর দাওয়াতি কর্মপদ্ধতির উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি দেখান, কীভাবে একজন মুজাদ্দিদ ধৈর্য, প্রজ্ঞা, চিঠিপত্র, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং আন্তরিক দোয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের বিশেষত সম্রাট জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের চিন্তাধারায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। ইতিহাসের এই উদাহরণ আজও দাওয়াতি প্রজ্ঞার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অন্যথায় 'দ্বীনে এলাহি' এর লেলিহান শিখায় ভারত উপমহাদেশের মুসলিম সমাজ ভস্ম হয়ে যেত।

উম্মাহর পুনর্জাগরণ

শায়খ সাজ্জাদ নদভীর এই সফরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই—উম্মাহর পুনর্জাগরণ কেবল আবেগ বা স্লোগানের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন গভীর ইলম, বিশুদ্ধ আখলাক, সুদূরপ্রসারী প্রজ্ঞা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, আধুনিক বাস্তবতার সঠিক উপলব্ধি এবং সর্বোপরি উম্মাহর প্রতিটি শ্রেণির মানুষের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় তাঁর এই বার্তাগুলো

খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা

​শায়খ সাজ্জাদ নদভী অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে এটি বোঝাতে চেয়েছেন যে, যেকোনো সুদূরপ্রসারী ও আদর্শবাদী পরিবর্তন রাতারাতি ঘটে না। আবেগ বা তাড়াহুড়ো করে সমাজ বা রাষ্ট্র ব্যবস্থার মতো জটিল কাঠামোগত রূপান্তর সাধন সম্ভব নয়। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, আত্মগঠন, জনশক্তি তৈরি, উপযুক্ত পরিবেশ এবং ধৈর্যশীল প্রচেষ্টার প্রয়োজন রয়েছে।

​

​তিনি আকীকার ছাগল কেনার একটি চমৎকার ও সহজবোধ্য রূপক ব্যবহার করেন। একটি সন্তান গর্ভে আসার সাথে সাথেই যেমন আকীকার প্রস্তুতি বা পশু কিনে ফেলা বোকামি ও হাস্যকর, তেমনি প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, জনশক্তি তৈরি এবং অনুকূল সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছাড়া খেলাফত প্রতিষ্ঠার অলীক স্বপ্ন দেখা বা জোরপূর্বক তা অর্জনের চেষ্টা করা একই রকম অবাস্তব। এর মাধ্যমে তিনি বুঝিয়েছেন যে, প্রতিটি কাজের একটি নির্ধারিত প্রাকৃতিক ও সময়ভিত্তিক নিয়ম রয়েছে, যা লঙ্ঘন করা যায় না। ​বক্তব্যে তিনি একটি মৌলিক তাত্ত্বিক ও বিশ্বাসগত পয়েন্ট তুলে ধরেছেন। খেলাফত বা ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রূপটি শেষ জামানায় হযরত ইমাম মাহদীর আগমনের মাধ্যমেই পূর্ণতা লাভ করবে—এটি ইসলামি পরকালীন তত্ত্বের একটি স্বীকৃত বিষয়।

শেষকথা

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় তাঁর এই বার্তাগুলো গভীরভাবে অনুধাবন করা গেলে আলিমসমাজ, মাদরাসা শিক্ষা, দাওয়াতি কার্যক্রম এবং জাতীয় ঐক্যের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে। তাঁর বক্তব্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—ইসলামের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে উঠবে বিভাজনের মাধ্যমে নয়; বরং জ্ঞান, প্রজ্ঞা, চরিত্র ও ঐক্যের সমন্বয়ে। শায়খ সাজ্জাদ নদভীর বক্তব্যে ছিল না বিভাজনের ভাষা, ছিল না প্রতিপক্ষকে আক্রমণের প্রবণতা; বরং ছিল আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি, একতা, প্রজ্ঞা এবং বাস্তবমুখী কর্মপরিকল্পনার আহ্বান। উম্মাহর পুনর্জাগরণের পথ বিভক্তির নয়, সমন্বয়ের; ঘৃণার নয়, মমতার; সংকীর্ণতার নয়, প্রজ্ঞার। শায়খ সাজ্জাদ নদভীর বাংলাদেশ সফরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই—একটি ঐক্যবদ্ধ, জ্ঞানসমৃদ্ধ, চরিত্রবান এবং দূরদর্শী মুসলিম সমাজই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। সেই প্রস্তুতি আজই শুরু করতে হবে।

লেখক: সাবেক উপদেষ্টা, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।